প্রিয় সেরেনাকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন জাপানি নাওমি

স্পোর্টস লাইফ, ডেস্কস্বপ্নের জয়? বিতর্কের ধোঁয়া উড়লেও তা বলাই যায়। ফাইনালে শৈশবের আদর্শ খেলোয়াড়কে হারিয়ে শিরোপা জয় এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নাওমি ওসাকার ক্ষেত্রে কিন্তু তা ঘটেনি। যতই সেরেনার-ভক্ত হন না কেন, কোর্টে তাঁর মুখোমুখি হয়ে নাওমি নিজেই নিজেকে বলেছেন, ‘আমি সেরেনাভক্ত নই। আমি একজন সাধারণ খেলোয়াড় যে আরেকজন খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হয়েছে।’

নাওমির সেই ‘আরেকজন খেলোয়াড়’ ওপেন যুগে সর্বোচ্চ ২৩ গ্র্যান্ডস্লামজয়ী সেরেনা উইলিয়ামস। তাঁর শৈশবের আদর্শ। ৩৬ বছর বয়সী সেরেনার খেলা দেখেই বড় হয়েছেন নাওমি। স্বপ্ন দেখেছেন একদিন ইউএস ওপেনে আদর্শের মুখোমুখি হবেন। নাওমি সেই স্বপ্ন ছুঁলেন কুড়ি বছর বয়সেই।

একটু ভুল হলো। ফ্লাশিং মিডোজের নীলচে কোর্টে স্বপ্ন জয় করলেন। সেই ইউএস ওপেনেই মেয়েদের একক ফাইনালে সেরেনাকে (৬-২,৬-৪) হারিয়ে টেনিস ইতিহাসে নতুন পাতা খুললেন ‘চেরি ফুলের দেশ’-এর কন্যা।

জাপানের নামটি সেই নতুন পাতায় এখন সোনার অক্ষরে লেখা। নাওমির আগে জাপান থেকে কেউ কখনো গ্র্যান্ডস্লামের একক শিরোপা জিততে পারেনি। জাপানে তাই এখন চলছে নাওমিকে অর্ঘ্য দেওয়ার উৎসব। কিছুদিন আগে টাইফুনে বিপর্যস্ত দেশটিতে শোক ভোলার উপলক্ষ এনে দিয়েছেন নাওমি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের টুইট, ‘জাপানের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে শিরোপাজয়। গোটা জাপানকে লড়াইয়ের শক্তি ও প্রেরণা জোগানোর জন্য ধন্যবাদ।’

জাপানের হোক্কাইডো দ্বীপে ভূমিকম্পে হতাহতদের দেখতে যাওয়ার পথে এই টুইট করেন শিনেজা আবে। এই দ্বীপেই বসত তেতসুয়ো ওসাকার। নাওমির দাদা। নিউইয়র্কে নাতনির ইতিহাস গড়া দেখে জীবনসঙ্গীকে নিয়ে তেতসুয়োর সে কী কান্না! আসলে আনন্দাশ্রু।

তেতসুয়োর এই নাতনি সেই তিন বছর বয়স থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। হাইতিয়ান বাবা ও জাপানিজ মায়ের সঙ্গে থাকেন ফ্লোরিডায়। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিকও নাওমি। হ্যারল্ড সলোমন ইনস্টিটিউটে টেনিস-দীক্ষা এরপর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। সেই পথচলায় এ বছর ইন্ডিয়ান ওয়েলস জয়ের পর বছরের শেষ গ্র্যান্ডস্লামে এসে নাওমি পেলেন অমরত্বের স্বাদ—জাপানের হয়ে পরে অনেকেই হয়তো গ্র্যান্ডস্লাম জিতবেন কিন্তু প্রথম জয়ের কীর্তিটা অমোচনীয়।

এই অমোচনীয় কীর্তি গড়ার আনন্দে জাপানের খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম ‘আসাহি শিম্বুন’ অতিরিক্ত সংস্করণ বের করে টোকিওতে বিলি করেছে। সেই সংস্করণটি শুধুই নাওমিকে উৎসর্গ করে। জাপানের টেনিসপ্রেমীরাও উৎসব করেছে নাওমির জয়ের আনন্দে। এদিকে সংবাদ সম্মেলনে জাপানের সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁকে পরতে হয়েছে বেকায়দায়।

সমস্যাটা তাঁর জন্য নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠায় নাওমি জাপানিজ ভাষাটা সেভাবে রপ্ত করতে পারেননি। বলতে গিয়ে কোথাও বেধে গেলে সেটুকু ঝেড়ে দেন ইংরেজিতে। জাপানিজরা কিন্তু নাওমির এই দুর্বলতাকে দেখছেন ইতিবাচক চোখে। এক নাওমিভক্তের টুইট, ‘তাঁর সাক্ষাৎকারই বলছে সে নির্ভেজাল জাপানি কোথায় জন্মেছে, কোথায় বড় হয়েছে, চামড়ার রং কিংবা ভাষা কোনো সমস্যা নয়। তুমি জাপানের গর্ব।’

চীনের লি নার পর দ্বিতীয় এশিয়ান হিসেবে গ্র্যান্ডস্লাম জিতলেন নাওমি। সেটিও আবার মাত্র পাঁচ বছর আগে পেশাদার টেনিসে আসার পর। প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্টে পা রেখেছিলেন দুই বছর আগে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে। ইন্ডিয়ানা ওয়েলসে শারাপোভা, প্লিসকোভা, হালেপদের হারিয়ে শিরোপা জয়ের পরের সপ্তাহে হারিয়েছিলেন সেরেনাকে। তখন কে জানত সেই হার ছিল এই হারের ‘ড্রেস রিহার্সেল’!

নাওমি নিজেও জানতেন না। ইউএস ওপেনের শিরোপা হাতে তাই আনন্দে ভেসে না গিয়ে থেকেছেন সংযত, বোঝার চেষ্টা করেছেন সেরেনার কষ্ট। চেয়ার আম্পায়ারের সঙ্গে গোটা ম্যাচে সেরেনার বাগ বিতণ্ডায় নষ্ট হয়েছে ম্যাচের সৌন্দর্য। তবে নাওমিকে ঠিকই অভিনন্দন জানিয়েছেন মার্কিন কৃঞ্চকলি, ‘সে ভালো খেলেছে।

এটি তাঁর প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম। চলুন সবাই মিলে মুহূর্তটা তাঁর জন্য স্মরণীয় করে তুলি।’ আর নাওমি? ভেজা চোখে মুখে ফুটল চিরায়ত জাপানিজ ভদ্রতা, ‘ম্যাচটা এভাবে শেষ হওয়ায় খারাপ লাগছে।’

ঠিকই তো। আদর্শকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের উদযাপনটা না হয় ঘরে ফিরেই হবে। তার আগে প্রতিপক্ষের ব্যথা বুঝে নিজেকে সংযত রাখতে পারাতেই জাত খেলোয়াড়ের পরিচয়।

Print Friendly, PDF & Email