বাল্য বিবাহ আর দারিদ্রতাকে পেছনে ফেলে বিজয় মঞ্চে অদম্য ইতি (ভিডিও)

হুমায়ুন সম্রাট : মেয়েটির পরিচয়টা আগে জেনে নেয়া যাক। নাম ইতি খাতুন, বর্তমান বয়স-১৪ বছর। বাবা-মো: ইবাদত আলী, মা- আলেয়া বেগম। তিন বোন ইভা, স্মৃতি ও ইতি। সব মিলে ৫জনের পরিবার। বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর থানায়। বাবা হোটেলে কাজ করেন। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে তারও আছে একটি মেয়ে। বড় বোনের স্বামী কিছুই করেন না। তাই বড় বোন ইভা বাবার পরিবারেই থাকেন মেয়েকে সাথে নিয়ে। আর ইতি পড়াশুনা করে ৮ম শ্রেণীতে। এই হলো ইতির পারিবারিক তথ্য।

ইতির বয়স যখন ১৩ বছর তখন পরিবার বিয়ের জন্য পাত্র দেখে! ২০১৬ সালের শেষ দিকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রমে আরচ্যারী ইভেন্টে চুয়াডাঙ্গা স্টেডিয়ামে অনুশীলন শেষে বাড়িতে গিয়ে দেখে দুজন লোক তাকে দেখতে এসেছে। ১৩ বছরের শিশু ইতি তাদের আসার অর্থটা সে সময় কিছুই বুঝতে পারেনি। ছেলে পক্ষ ইতিকে পছন্দ করে চলে যাওয়ার পর সে জানতে পারে তার বিয়ের জন্য তাকে দেখতে এসেছিল।

কোন কারনে সে যাত্রা বাল্য বিবাহের হাত থেকে বেঁচে যায় ইতি।

এখন ইতির বয়স ১৪ বছর। বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনায় দেশব্যাপী আয়োজিত বাংলাদেশ যুব গেমসে ইতি চূড়ান্ত পর্বে অংশ গ্রহন করে খুলনা বিভাগের হয়ে।

ছোট্ট মেয়েটি যুব গেমসে তরুনী একক, দলীয় ও মিক্স টিম ইভেন্টে ৩টি ব্রোঞ্জ পদক জয় করে! দলের অন্য সদস্যরা যদি ইতির মত স্কোর করতে পারতো তাহলে ইতির গলায় ঝুলতে পারতো স্বর্ণ বা রৌপ্য পদক।

সব মিলে ইতির খেলোয়াড়ী জীবনে মাত্র এক বছরে জয় ৫টি ব্রোঞ্জ মেডেল! এই পদক গুলোতেই ইঙ্গিত মেলে  ইতির প্রতিভা নিয়ে।

আরচ্যারী নিয়ে ইতির অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে বাল্য বিবাহের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেই দু:স্মৃতি ও দারিদ্রতার কালো থাবা।

তীর-ধনুক হাতে ভাল করার স্বপ্ন নিয়ে ছোট্ট বুকে শত কষ্টের মাঝেও নিশানা ভেদ করে চলেছে ইতি।

অল্প সময়ের মধ্যে এমন সাফল্যের পরও বার বার ইতিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে বাল্য বিবাহের হাতছানি। পরিবার যখন দারিদ্রতায় কাছে বার বার হার মানছে তখন ইতির স্বপ্নও উড়ছে ঘুড়ির মত। যখন তখন কেটে হাওয়ায় ভেসে যাবে অজানা কোথাও।

ইতির স্বপ্ন বড় খেলোয়াড় হয়ে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদক জেতা। খেলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান হলে অভাবী পিতা-মাতার পাশে দাঁড়াতে পারতো সে।

আরচ্যারী খেলাটা সে চালিয়ে যেতে যায় কিন্তু মনের মধ্যে সব সময় ভয়ও কাজ করে অভাবী সংসার যখন চলে না তখন খেলা চালিয়ে যাওয়া কত দুর সম্ভব?

কথা বলার সময় ইতির ছোট্ট মুখে ছিল কষ্ট লুকানো মিটিমিটি হাসি। কিন্তু সে হাসি কতটা বেদনার তা শুরু ইতিই অনুভব করতে পারে। ছোট্ট মেয়েটি কষ্ট লুকিয়ে বলছিলো কেউ যদি তার পাশে দাঁড়াতো তাহলে তার অভাবী পরিবার ও খেলা নিয়ে তার স্বপ্নটা বেঁচে থাকতো —

বাংলাদেশ যুব গেমসে ইতি এক বিরাট আবিস্কার। সে দেখিয়ে দিল মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়। দারিদ্রতা ও কষ্টের কাছে স্বপ্ন কখনও হার মানে না। ইতির মত প্রতিভাবান তরুন-তরুনীরা যারা দেশের জন্য পদক জয়ের স্বপ্ন দেখে তাদের হাতেই একদিন অবশ্যই উড়বে বাংলার লাল-সবুজ পতাকা।

বাকি কথা গুলো শুনুন ইতির মুখেই নিচের ভিডিওতে—

Print Friendly, PDF & Email