বাংলাদেশের কষ্টার্জিত আফগান জয়

স্পোর্টস লাইফডেস্ক : ‘এশিয়া কাপের ম্যাচটা মনে আছে নিশ্চয়’-আজগর স্ট্যানিকজাইয়ের কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় বাংলাদেশের। বছর দুয়েক আগে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে বাংলাদেশকে যে হারিয়ে দিয়েছিল আফগানরা।

ফতুল্লার ওই ম্যাচের স্মৃতি রোমন্থন করে আফগান অধিনায়ক সতর্কবার্তা পাঠিয়ে রেখেছিলেন স্বাগতিকদের। সেটা শুধু মুখে নয়, মাঠের ক্রিকেটেও প্রমাণ করতে চলেছিল আফগানরা!

কিন্তু দলটা যে ‘অন্য’ বাংলাদেশ, যারা হারার আগে হারতে রাজি নয়। তাই তো আশার সবগুলো দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও নিরাশ হয়নি একবারের জন্যও। যে আত্মবিশ্বাস গোটা ম্যাচে ছড়ি ঘোরানো আফগানিস্তানকে বোতলবন্দি করে পেল ৭ রানের শ্বাসরুদ্ধকর এক জয়। স্বাগতিকরা ৫০ ওভারে অলআউট হওয়ার আগে স্কোরে জমা করেছিল ২৬৫ রান। জবাবে দুর্দান্ত পারফরম করেও ৫০ ওভারে অলআউট হওয়ার আগে ২৫৮ রানের বেশি করতে পারেনি আফগানিস্তান।

২৬৬ রানের লক্ষ্যে দ্রুত ২ উইকেট হারিয়ে আফগানরা চাপে পড়লেও রহমত শাহ ও হাশমতউল্লাহ শাহিদির ব্যাটে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দারুণভাবে। এতটাই যে বাংলাদেশের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছে তারাই। যদিও শেষ তিন ওভারে পাল্টে যায় সব হিসাব। তাসকিন আহমেদ স্বরুপে ফিরলে প্রায় হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ম্যাচ জিতে নেয় বাংলাদেশ। অবৈধ্য বোলিং অ্যাকশন শুধরে প্রথমবার আন্তর্জাতিক ম্যাচে ফিরে শুরুটা ভালো না হলেও নিজের শেষ স্পেলে তাসকিন আউট করেছেন মোহাম্মদ নবী (৩০), আজগর স্ট্যানিকজাই (১০) ও মিরওয়াইস আশরাফকে (৩)। তাতেই আসলে ম্যাচ চলে আসে বাংলাদেশের হাতে।

শুরু থেকেই দেখে শুনে খেলেছেন আফগানদের দুই ওপেনার শাবির নুরি ও মোহাম্মদ শাহজাদ। যদিও সপ্তম ওভারে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠা এই জুটিকে ভাঙেন মাশরাফি। ফেরান শাহদাজকে (৩১)। এর পর সাকিব নিজের প্রথম ওভারে বোলিং করতে নেমেই আরেকবার ধাক্কা দেন সফরকারীদের। ৯ রান করা নুরিকে এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে ফেরেন এই অলরাউন্ডার। দ্রুত ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়া আফগানিস্তানকে টেনে তোলেন রহমত-শাহিদি জুটি।

ঠান্ডা মাথার ব্যাটিংয়ে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে নিয়েছেন দলের স্কোর। তৃতীয় উইকেট জুটিতে তারা যোগ করেন ১৪৪ রান। ৭১ রানে রহমত শাহ সাকিবের বলে আউট হলে ভাঙে তাদের জুটি। শাহিদিও (৭২) খানিক পর ধরেন তার পথ। যদিও তাদের গড়ে দেওয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে জয়ের পথেই এগোতে থাকে আফগানিস্তান। কিন্তু শেষ দিকে তাসকিনের দুর্দান্ত এক স্পেল পাল্টে দেয় সব হিসাব। এই পেসার ৮ ওভারে ৫৯ রান খরচ করে পেয়েছেন ৪ উইকেট। ম্যাচসেরা হওয়া সাকিব এবং মাশরাফির শিকার ২টি করে উইকেট।

এর আগে প্রায় ১০ মাস পর ওয়ানডেতে ফিরে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ। দলের সঙ্গে ৫০ ওভারের ম্যাচে ফিরেছিলেন তামিম ইকবাল-মাহমুদউল্লাহও। মাঝে এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের পারফরম্যান্সে কোনও বদল নেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ করেছিলেন যেখানে, সেখান থেকেই যেন করলেন শুরু। এই দুই ব্যাটসম্যান পান ব্যাক টু ব্যাক হাফসেঞ্চুরি।

শুরুটা করেছিলেন তামিম। যদিও তার আগেই আফগানিস্তান চেপে ধরেছিল টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা স্বাগতিকদের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গত কিছুদিন খুবই বাজে সময় পার করা সৌম্য সরকার আবারও ব্যর্থ হয়ে ফিরলেন প্যাভিলিয়নে। রানের খাতার খোলার আগেই দৌলত জারদানের বলে আউট হলে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। অবশ্য চাপটা চেপে ধরতে দেননি তামিম-ইমরুল।

দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে তারা যোগ করেন ৮৩ রান। সাবলীল ব্যাটিংয়ে তারা বাড়িয়ে নেন স্কোর। কিন্তু ইমরুলের একটি ভুলে ভাঙে তাদের জুটি। দারুণ শুরুর পরও ইনিংসটা বেশি দূর এগিয়ে না নেওয়া আক্ষেপে অবশ্যই পুড়ছেন তিনি। ব্যক্তিগত ৩৭ রানে বোল্ড হয়েছেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ নবীর বলে। ৭৫ বলের ইনিংসটি তিনি সাজিয়েছিলেন ৬ বাউন্ডারিতে।

তিনি না পারলেও তার ওপেনিং সঙ্গী তামিম কিন্তু ভুল করেননি হাফসেঞ্চুরি পূরণ করতে। এমনকি সেঞ্চুরির পথেও হাঁটছিলেন তিনি। কিন্তু মিরওয়াইস আশরাফের একটি বলে স্বপ্ন ভঙ্গ হয় বাংলাদেশি ওপেনারের। সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও যে আউট হয়ে গেছেন তিনি ৮০ রানে। নাভিদ-উল-হকের হাতে ধরা পড়ার আগে ৯৮ বলের ইনিংসটি তিনি সাজিয়েছিলেন ৯ বাউন্ডারিতে।

এর আগে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৯তম হাফসেঞ্চুরির দেখা পান তামিম। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নিজের সবশেষ ম্যাচেও ফিফটি করেছিলেন তিনি, প্রায় ১০ মাস পর ওয়ানডেতে ফিরে আবারও করেন বাজিমাত।

আউট হওয়ার আগে তামিম তৃতীয় উইকেট জুটিতে ৭৯ রান যোগ করেন মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে। সমান তালে লড়েছেন তারা। ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনীতে মাহমুদও পূরণ করেন তার হাফসেঞ্চুরি। তার পরও আফগান বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে খেলছিলেন মাহমুদ। যদিও সেই দাপট বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখতে পারেননি তিনি।

৬২ রান করে এই ব্যাটসম্যান আউট হয়েছেন মোহাম্মদ নবীর বলে। সুইপ শট খেলে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে ধরা পড়েন মিরওয়াইস আশরাফের হাতে। ৭৪ বলের ইনিংসটি তিনি সাজিয়েছিলেন ৫ চার ২ ছক্কায়। মাহমুদ ফেরার পর পরই মুশফিকুর রহিম আউট হলে আবার চাপে পড়ে বাংলাদেশ। রশিদ খানের গুগলি বলে সরাসরি বোল্ড হয়ে ফেরেন তিনি ৬ রানে।

অন্য প্রান্তে অবশ্য লড়ে গেছেন সাকিব আল হাসান। মাহমুদের আউটের পর তিনি ধরেন দলের হাল। দারুণ ব্যাটিংয়ে দলের স্কোর বাড়িয়ে নিলেও খানিকটা হলেও আক্ষেপে পুড়ছেন এই অলরাউন্ডার। মাত্র ২ রানের জন্য যে হাফসেঞ্চুরি করতে পারেননি তিনি। ৪০ বলে ৩ চারে ৪৮ রানে আউট হয়েছেন তিনি দৌলতের বলে।

তার আগেই অবশ্য প্যাভিলিয়নে ফেরেন সাব্বির রহমান। ২ রান করে রশিদের বলে আউট হলেও টিভি রিপ্লেতে দেখা গেলে এলবিডাব্লিউ ছিলেন না তিনি। এর পর আর কোনও ব্যাটসম্যানই করতে পারেননি কিছু। শেষ পর্যন্ত তো ৫০ ওভারে অলআউট হয় স্বাগতিকরা, তার আগে স্কোরে জমা করে ২৬৫ রান।

এই স্কোরটাই পেরোতে পারেনি আফগানিস্তান। অনেক নাটকীয় মুহূর্তের পর শেষ পর্যন্ত কষ্টার্জিত আফগান জয় করে মাশরাফি-তাসকিনরা।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার