রিও ‘ডিজিটাল’ অলিম্পিক

স্পোর্টস লাইফডেস্ক : এবারের রিও অলিম্পিককে ‘ডিজিটাল অলিম্পিক’ হিসেবে অভিহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই বলছেন, এটি ইন্টারনেট যুগের প্রথম অলিম্পিক, যেটিতে টেলিভিশন সম্প্রচারের ভিত নড়িয়ে দিয়েছে অনলাইন সম্প্রচার। একটা ছোট্ট তথ্যেই বোঝা যায়, রিও অলিম্পিক টেলিভিশন সম্প্রচারকে কতটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে—রিও অলিম্পিকের প্রথম চার দিন দর্শকেরা যে পরিমাণ ছবি (খেলা কিংবা অলিম্পিক–বিষয়ক অন্য কিছুর) অনলাইনে দেখেছেন, তা ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকের মোট পরিমাণের সমান। রিও অলিম্পিককে ‘ডিজিটাল’ গেমস হিসেবে অভিহিত না করে কি কোনো উপায় আছে?

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রধান টমাস ব্যাচ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে অলিম্পিক সম্প্রচারের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান এনবিসি পুরো অলিম্পিকের ২০০ কোটি মিনিটেরও বেশি মুহূর্ত তাদের ওয়েবসাইটে প্রচার করেছে। এই দুনিয়ায় সাম্প্রতিক কালে প্রতিমুহূর্তে ঘটে চলা ডিজিটাল বিপ্লবের ছোঁয়াও দুর্দান্তভাবেই লেগেছে এবারের রিও অলিম্পিকে। স্মার্টফোন কিংবা ট্যাবলেটেই অলিম্পিকের বিভিন্ন ইভেন্টের সরাসরি সম্প্রচারিত দৃশ্য উপভোগ কিংবা এর খবরাখবর নিয়েছেন বেশির ভাগ ক্রীড়াপ্রেমী।

তবে কি টেলিভিশন সম্প্রচার এবার ফ্লপ? অলিম্পিক সম্প্রচারের প্রধান নির্বাহী ইয়ান্নিস এক্সারকোস জানিয়েছেন, ফ্লপ মোটেও বলা যাবে না। বেশির ভাগ সম্প্রচার সংস্থা ব্যাপারটি নিয়ে আগে থেকেই ভেবেছে এবং বেশ আটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছে। তাদের প্রায় সবারই নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ছিল এবং সেই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহা​র করেই তারা ক্রীড়াপ্রেমীদের টেলিভিশন পর্দায় টেনে নিয়ে এসেছে।’ তবে এবারের অলিম্পিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তিশালী উপস্থিতি এক্সারকোস অস্বীকার করেননি, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তথ্য সম্প্রচারের ধারণাটাই খুব দ্রুত পাল্টে দিচ্ছে। এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম কিন্তু খুব বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে সনাতন গণমাধ্যমগুলোর জন্য।’

এবারের অলিম্পিক গেমসকে ‘ভবিষ্যৎ অলিম্পিকের মঞ্চ-মহড়া’ হিসেবেও অভিহিত করছেন গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা। কারণ, রিওঅলিম্পিকে এমন অনেক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, যেগুলো ভবিষ্যতের আসরগুলোতে খুব সাধারণভাবেই ব্যবহার হবে। জাপানের রাষ্ট্রীয়টেলিভিশন সংস্থা এনএইচকে এবার পরীক্ষামূলকভাবে ‘এইট-কে’ ফরম্যাটে অলিম্পিক সম্প্রচার করেছে, যা বর্তমানের অত্যাধুনিক ‘হাই-ডেফিনেশন’ বা এইচডি ফরম্যাটের চেয়ে ১৬ গুণ পরিষ্কার ছবি দর্শকদের উপহার দিতে পারে। এই প্রযুক্তিতে মাইকেল ফেল্‌প্‌সের ১০০মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতার কিংবা উসাইন বোল্টের ১০০ মিটার স্প্রিন্ট বা অলিম্পিকের অন্যান্য খেলাগুলো দেখলে দর্শকদের মনে হবে,তারা অনেকটাই ভ্যেনুতে বসে এগুলো উপভোগ করছেন।

২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে হয়তো ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তির ব্যবহার হবে। রিওতে এটির পরীক্ষামূলক ব্যবহার খুব অল্পপরিসরে হয়েছে। এই প্রযুক্তিতে দর্শকদের মনে হবে তারা একেবারে সুইমিং পুল বা অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের পাশে দাঁড়িয়ে বা বসে খেলাউপভোগ করছেন। অলিম্পিকের তারকা ক্রীড়াবিদদের এই প্রযুক্তিতে খুব কাছের মানুষ মনে হবে তাদের।

ডিজিটাল অলিম্পিক এর সম্প্রচারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি যে ব্যাপারটি নিয়েভাবছে, সেটা হলো, এই সব প্রযুক্তির কারণে মাঠে বসে খেলা দেখার আগ্রহীর সংখ্যা কমে যাওয়া। এবারের অলিম্পিকের বিভিন্ন ভ্যেনুতেশত শত দর্শক আসন খালি পড়ে থাকার ব্যাপারটি ভ্রুকুটি তুলেছে আয়োজকদের মধ্যে। নিজেদের পকেটে থাকা স্মার্টফোন কিংবাট্যাবেই যেখানে অলিম্পিক দেখে ফেলা যাচ্ছে, সেখানে কার এত ইচ্ছা বা সময় আছে যাতায়াতের ঝক্কি পেরিয়ে মাঠে বসে খেলা দেখার।তারমানে কী ভবিষ্যতে এমন একটা সময় আসছে, যখন খালি ময়দানেই নিজেরে ক্রীড়াশৈলির কসরত দেখাবেন খেলোয়াড়েরা?

এক্সারডোস মনে করেন, টেলিভিশন তো অনেক আগেই এসেছে। এখন ডিজিটাল যুগ। কিন্তু মাঠে গিয়ে খেলা দেখার আবেদন কিন্তুকোনো দিনই ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। দর্শকেরা কিন্তু মাঠের সৌন্দর্যেরই অংশ। রিও অলিম্পিকের অর্ধেক খালি স্টেডিয়ামগুলো টেলিভিশনেরপর্দায় যখন দেখা গেছে, এর চেয়ে খারাপ দৃশ্য আর ছিল না বলেই আমার বিশ্বাস।’মাঠে দর্শক আনার ‘ডিজিটাল’ কোনো প্রযুক্তি কী আবিষ্কৃত হয়েছে!

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার