সিমান্তদের নিষিদ্ধ করলো এশিয়ান ওয়েটলিফটিং ফেডারেশন!

স্পোর্টস লাইফ, প্রতিবেদক সিমান্তর কান্নার দৃশ্যটা টিভিতে দেখে গোটা বাংলাদেশ আবেগে ভেসেছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে গুয়াহাটির এসএ গেমসে সোনা জিতে পোডিয়ামে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। তা সবার হৃদয়ে নাড়া দেয় দারুণভাবে। দেশে ফিরে মাবিয়া শুধু একটা জিনিসই চেয়েছিলেন নিয়মিত খেলার সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগ পেলেন না। ভারোত্তলন ফেডারেশনে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মাবিয়াদের সামনের দিনগুলোকে ঢেকে দিয়েছে অন্ধকারে।

দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা মহিউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ভালোই চলছিল সব। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলোয়াড়দের সুযোগও মিলছিল নিয়মিত। হয়েছে অনুশীলন। তারই ফলে দেশের বাইরে থেকে আসে স্বর্ণ সহ নানা পদক।

গত ৯ জুন মহিউদ্দিন আহমেদের কমিটি ভেঙে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) অ্যাডহক কমিটি করলে সংকটের শুরু হয়। মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠন করা হয় নতুন এই অ্যাডহক কমিটি। সভাপতি থাকলেন আগেরজনই, মনজুর কাদের কোরেইশি। নতুন কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পেরোলেও নির্বাচনের খবর নেই!

তা ছাড়া খেলাটিও এগিয়ে নিতে পারেনি এই কমিটি। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড় না পাঠানোয় তৈরি হয় শূন্যতা। ফেডারেশনের সাংগঠনিকভাবে দুর্বলতার প্রভাব পড়ে খেলোয়াড়দের ওপর। সব দেখে খোদ এনএসসি সচিব অশোক কুমার বিশ্বাসও নাখোশ এই কমিটির ওপর। সচিব বলেন,‌ আমরা যা চেয়েছিলাম, এই কমিটি তা করতে পারেনি। তারা পুরোপুরি ব্যর্থ।

শুধু তাই নয় এই ব্যর্থতার জন্য এশিয়ান ওয়েটলিফটিং ফেডারেশন বের করে দেয় বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশনকে। সংস্থাটি বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনকে সাফ জানিয়ে  দেয়, বর্তমান অ্যাডহক কমিটি অবৈধ।

নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আগের নির্বাচিত কমিটিই দ্রুত পুনর্বহালের তাগিদও দিয়েছে। কোনো অনির্বাচিত কমিটির সঙ্গে তারা সম্পর্ক রাখবে না। বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের ভারোত্তোলকরা এমিয়ান ওয়েটলিফটিং ফেডারেশন কর্তৃক আয়োজিত কোন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করতে পারবে না।

ওই চিঠি পেয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নড়েচড়ে বসেছে। তারা বলছে, মহিউদ্দিন আহমেদের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১২ সালের নভেম্বরে। কাজেই আগের কমিটি এখন আর নির্বাচিত নয়। তাই তাদেরকে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।

এনএসসি সচিব আজ বৃহস্পতিবার (৩নভেম্বর) বলেন, ‘‌আমরা অ্যাডহক কমিটি করেছি নিয়ম মেনেই। কারণ, আগের কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ। তা ছাড়া এখানে সরকার হস্তক্ষেপ করেনি। এনএসসি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এটি তার নিজস্ব আইনেই চলছে।’

এখানে বলে রাখা ভাল, খোঁজ নিয়ে জানা গেল আগের নির্বাচিত কমিটি নির্বাচন দেয়ার জন্য এনএসসিকে মুখে ও লিখিত ভাবে অনেক বার বলেছে। কিন্তু এনএসসি নির্বাচন আয়োজন করতে পারেনি।   

এশিয়ান ভারোত্তোলন ফেডারেশনকে নিজেদের এই বক্তব্য দ্রুত জানানোর কথাও বলেছেন এনএসসি সচিব। একই সঙ্গে দ্রুতই নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিলেন। এ কমিটিকেই আরও কিছুদিন সময় বেঁধে দিতে চান এই কর্মকর্তা।

প্রশ্ন হচ্ছে, কবে নাগাদ এই সংকট কাটবে? কী হবে এখন? এখানেই মাবিয়াদের জন্য আরও বড় দুঃসংবাদ। ফেডারেশনে ক্ষমতার বলি হচ্ছেন তাঁরা। মাবিয়া তাই দুঃখ করে বললেন, ‘এসএ গেমসের পর আমাদের এমন ভাগ্য বরণ করতে হবে ভাবিনি। আমরা চাই খেলা। সেই খেলাই যদি না পাই, তাহলে আমরা কীভাবে এগিয়ে যাব।’

মাবিয়াসহ অনেকেই এখন বাড়িতে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকেন। এসএ গেমসের পর গত নয় মাসে শুধু একটি আন্তর্জাতিক মিটে যাওয়ার ‌সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। এপ্রিলে উজবেকিস্তানে হয়েছে অলিম্পিক গেমসের কোয়ালিফিকেশন রাউন্ড। তাও সেটি আগের কমিটির সময়।

বর্তমান কমিটি আসার পর ছয় মাসে মাবিয়ার সামনে খেলার জগৎটা হয়ে উঠেছে অচেনা। তাঁকে কোথাও পাঠানো হচ্ছে না। জর্ডানে আফ্রো–এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, মালয়েশিয়ায় যুব বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, একই ভেন্যুতে কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপ কোথাও নেই মাবিয়া।

এর মধ্যে শুধু কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে সিনিয়র দল অংশ নিয়েছে। জুনিয়র পর্যায়ে দলই পাঠানো হয়নি। মাবিয়া খেলতেন জুনিয়র ও যুব পর্যায়ে। ৮ নভেম্বর জাপানে শুরু যুব ও জুনিয়র এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও মাবিয়াদের পাঠাবে না ফেডারেশন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে মাবিয়ার নাম নিবন্ধন করেনি ফেডারেশন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধন হলেও তাঁকে পাঠানো হয়নি।

মাবিয়াদের মাধ্যমে যে ফেডারেশনের এত সাফল্য, সেই সোনালী আলো কী তাহলে বর্তমান অ্যাডহক কমিটির ব্যর্থতার কারণে তা নিভে যাবে?

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার