উশু’র মেসবাহ: পরিশ্রমই যার সাফল্য

হুমায়ুন সম্রাট :  মেজবাহ উদ্দিন। অনেকেই আদর করে ডাকেন বাবু বলে। জন্ম ঢাকায়। উশুর সাথে যুক্ত হন ১৯৯৬ সালে। এরপর চীন থেকে আগত চাইনিজ উশু টিম মি. মা, সু ও মি. লি’র কাছে উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন ১৯৯৮ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জিমন্যাশিয়ামে।

এরপর বাংলাদেশ জাতীয় উশু দলের পক্ষে প্রথম অংশ নেন ২০০৫ সালে ভিয়েতনামের হেনয় আয়োজিত ৮ম ওয়ার্ল্ড উশু চ্যাম্পিয়নশিপে।

এরপর দেশে ২০০৭ সালে আয়োজিত প্রথম জাতীয় উশু প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অর্জন করেন ৪টি স্বর্ণ পদক।ধীরে ধীরে মেজবাহ দেশের সিমানা পেরিয়ে নিজের মেধা ও যোগ্যতা মেলে ধরতে থাকেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

২০০৮ সালে জাতীয় উশু প্রতিযোগিতায় অাবারও মেসবাহ অর্জন করেন ৩টি স্বর্ণ পদক।

joy

একই বছর ২০০৮ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় ৩য় দক্ষিণ এশিয়া উশু চ্যাম্পিয়নশিপ। উক্ত প্রতিযোগিতায় দেশের পক্ষে অংশ নেন মেজবাহ। সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দল পায় ৩টি স্বর্ণ পদক। এই ৩টি স্বর্ণ পদকের মধ্যে মেজবাহ উদ্দিন পান একাই ২টি স্বর্ণ পদক!

ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৩য় দক্ষিণ এশিয়া উশু চ্যাম্পিয়নশিপে মেজবাহ’র এই সাফল্যের মুল কারণটা ছিল নেপাল থেকে আগত কোচ মি. গোপাল শ্রেষ্ঠার কাছে উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহন। মুলত তার কাছ থেকেই মেজবাহ আধুনিক উশুর কৌশলটা রপ্ত করেন।

ঢাকায় ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত ১১তম সাউথ এশিয়ান গেমস (এসএ গেমস) উপলক্ষে স্বাগতিক বাংলাদেশ ভাল ফলাফলের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহন করে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন।

প্রথম বারেরমত দীর্ঘমেয়াদী আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ডাক পান মেজবাহ। এ সময় চায়নিজ কোচ মি. ওয়াং চাই লিং এর অধিনে নিয়মিত দুই বেলা প্রশিক্ষণ চালিয়ে যান মেসবাহ ।

শুধু তাই নয় দেশকে কিছু দেয়ার স্বপ্ন নিয়ে নির্ধারিত প্রশিক্ষণের বাইরে নিজ উদ্দেগ্যে করেন জিমে পাওয়ার ট্রেনিং ও বাড়তি অনুশীলন। বৃথা যায়নি মেজবাহ’র সেই পরিশ্রম। ঔ যে কথায় বলে “কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে”।

২০১০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১১তম এসএ গেমসে হলোও তাই। পরিশ্রমের ফল হাতে নাতে পেয়ে গেলেন মেজবাহ। জিতলেন গোল্ড মেডেল। এসএ গেমসে বাংলাদেশের অর্জিত ১৮টি স্বর্ণ পদকের ১টি স্বর্ণ এলো মেজবাহ হাত ধরে।  তার পুরস্কারও পেলেন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে।

pic-1

পুরস্কৃত সেই সন্ধ্যার আলোকিত দৃশ্যটা আজো মেজবাহকে নিরবে নিভৃতে উৎসাহ দেয় দেশের জন্য কিছু করার। মেজবাহ থেমে যাননি। তারপর থেকে নিজেকে আরো উচ্চতায় মেলে ধরতে চালিয়ে যান কঠোর অনুশীলন।

এরপর ২০১০ সালে চিনের গুয়াংজুতে অনুষ্ঠিত ১৬তম এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পক্ষে অংশ গ্রহন করেন তিনি।

২০১২ সালে দেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় উশু প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিয়ে অর্জন করেন ২টি স্বর্ণ পদক।

এস এ গেমসে স্বর্ণজয়ী মেজবাহ তার সোনালী খেলোয়াড়ী জীবনের ইতি টানেন ২০১৩ সালে। তবে তিনি ঘরে বসে থাকেননি। উশুর ভালবাসার টানে ফিরে আসেন আবারও ম্যাটে। তবে এবার মেজবাহ নিজেকে দাঁড় করান কোচের ভূমিকায়। লক্ষ্য দেশের জন্য তরুণদের তৈরী করা।

pic-7

নেপাল থেকে কোচিংয়ের উপর ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন করেন। এছাড়া বাংলাদেশে আয়োজিত সাউথ এশিয়া উশু কোচেস ও জাজেস কোর্স সম্পন্ন করেন।

কোচ হিসেবে প্রথম কাজ শুরু করেন বাংলাদেশ পুলিশ দলের। তারপর কাজ করেন ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দলের।

২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচিয়ন-এ অনুষ্ঠিত ১৭তম এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ উশু দলের হেড কোচের দায়িত্বে ছিলেন মেসবাহ।

pic-2

দেশের উশুকে কিছু দেয়া মেসবাহ একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে তিনি প্রতিদিন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জিমন্যাশিয়ামে একদল তরুণ ছেলে-মেয়েকে প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন নিবীড় ভাবে।

pic-5

উশু নিয়ে মেজবাহ তার স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানান, আজকে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ও বিশ্বের অনেক দেশে আমাকে যে অনেকেই চেনেন তা উশুর জন্য। আমি উশু কাছে চিরকতৃজ্ঞ। সেই কতৃজ্ঞতা থেকে দেশের জন্য কিছু করতে চাই এটাই আমার একমাত্র স্বপ্ন। এখন আমি এনএসসি তে উশু (চাইনিজ মার্শাল আর্ট) প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। নিজে শাওলিণ উশু ফাইটার স্কুল খুলেছি। কেউ যদি উশু শিখতে চায় তাহলে সরাসরি (০১৭১২১৩৬৮৮২) আমার সাথে যোগযোগ করলে শিখতে পারবে।

pic-4

তিনি আরো জানান, আমি এমন কিছু খেলোয়াড় তৈরী করতে চাই যারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে পদক জিতে বাংলাদেশকে গর্বিত করবে।

বলে রাখা ভাল মেসবাহ’র তৈরী ২জন খেলোয়াড় মোতাহার হোসেন ও আবু বক্কর এরই মধ্যে বাংলাদেশ দলের হয়ে এশিয়ান গেমস ও এসএ গেমসে অংশ গ্রহন করেছেন।

তারা এখন বাংলাদেশ আনসার এর উশু টিমের খেলোয়াড়।

উশুকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন মেসবাহ,  পরিশ্রমই যার সাফল্য, জয় হবেই হবে একদিন।

Print Friendly, PDF & Email