জীবনযুদ্ধের সাঁতার কেটে রিও অলিম্পিক্সের পাড়ে

স্পোর্টস লাইফডেস্ক : ইয়ুসরা মারদিনি আর পাঁচজন কিশোরীর মতোই ছিল। মুখে চিউয়িংগাম। হাতে স্মার্টফোন। সদাহাস্যময়। তিন বোনের মধ্যে মেজো মারদিনি। সিরিয়ায় পৈতৃক বাড়িতে বাবা-মার সঙ্গে বেশ আনন্দেই ছিল। বাবা পেশায় সাঁতার প্রশিক্ষক। মারদিনি জিমন্যাস্টিক্স ক্লাবে যেত নিয়মিত। আর ভালবাসত সাঁতার।

তারপরই শুরু সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। চারদিকে প্রাণহানি, বারুদের গন্ধ। হাসি বদলে গেল হাহাকারে। বাড়িগুলো যেন রাতারাতি পরিণত হল নরকে। ওলটপালট হয়ে গেল মারদিনির জীবনও। মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে পড়েও প্রাণরক্ষা হয়েছিল কোনওমতে। আগুনে তাদের বাড়ি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসে যে সুইমিং পুলে দাপিয়ে বেড়াত হাসিখুশি মেয়েটি, সেটির ছাদ বোমার আঘাতে ভেঙে পড়েছিল। অষ্টাদশী মারদিনির কাছে জীবনটাই যেন যন্ত্রণার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সমস্ত প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে সেই মারদিনিই এখন তৈরি অলিম্পিক্সের সুইমিং পুলে ঝড় তুলতে। রিওতে বাস্তুহীনদের হয়ে নামছে সে। পদক জয়ের স্বপ্নও দেখছে। যদিও সেই স্বপ্নের নেপথ্যে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের কাহিনি। প্রাণ বাঁচাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটে অসাধ্য সাধন। যা হার মানাতে পারে হিচককের সিনেমার রোমাঞ্চকেও।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের আগুনে তখন প্রাণ হারাচ্ছেন শয়ে শয়ে মানুষ। মারদিনির সামনে তখন দু’টো পথ খোলা ছিল। হয় সিরিয়াতেই সমস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাও, অথবা স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা ফিরে পেতে দেশ ছেড়ে পালাও। মারদিনি বেছে নিয়েছিল দ্বিতীয় বিকল্পটিই। ‘‘রাস্তায় মারা যাওয়ার ভয় ছিল। তবে দেশে তো মৃতপ্রায় অবস্থাতেই দিন কাটাচ্ছিলাম। আর সহ্য করা সম্ভব ছিল না,’’ স্বীকার করে নিয়েছে মারদিনি নিজেই।

দিনটা ছিল ১২ অগস্ট, ২০১৫। দুই কাকা, দিদি সারা এবং আরও কয়েকজন বাস্তুহীনদের সঙ্গে দেশ ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েছিল মারদিনি। বাবা-মা ও বোন থেকে গিয়েছিলেন সিরিয়াতেই। গৃহযুদ্ধে ততদিনে আড়াই লক্ষেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ‘‘আমি নিজের জীবনের জন্য চিন্তিত ছিলাম। পাশাপাশি ভয় ছিল গন্তব্যে পৌঁছে গেলেও দিদির না কিছু হয়ে যায়,’’ পরে বলেছিল মারদিনি।

দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল তাদের। দক্ষিণ তুরস্কের পাহাড় ও উপত্যকা। জঙ্গলে কাটাতে হয়েছিল চার রাত। না ছিল খাবার, না জল। সেই সঙ্গে সশস্ত্র পাচারকারীদের রক্তচক্ষু। তাদের মধ্যেই একজন রাজি হয়েছিল মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ডিঙ্গিতে চাপিয়ে তাদের গ্রিসে পৌঁছে দিতে। ছ-সাতজনের বদলে মোটরচালিত যে ডিঙ্গিতে তোলা হয়েছিল প্রায় কুড়িজনকে। রওনা হওয়ার আধঘণ্টা পরেই লেসবস দ্বীপের কাছে গিয়ে সেই মোটর খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ছোট্ট নৌকায় জল উঠে যাচ্ছিল। জিনিসপত্র ফেলে দিয়েও রেহাই মেলেনি। শেষে কার্যত বাধ্য হয়েই গভীর সমুদ্রে সাঁতার কাটার সিদ্ধান্ত। মারদিনির কথায়, ‘‘দিদি আপত্তি করেছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল সাঁতারু হওয়ার পরেও ডুবে মরতে হলে তার চেয়ে লজ্জাজনক কিছু হয় না।’’

তিনজন মিলে বরফশীতল জলে নেমে দড়ি ধরে টেনে ডিঙ্গিকে পাড়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াই শুরু। একটা সময় সকলেই বেদম হয়ে পড়েছিল। মারদিনি বলছে, ‘‘চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছি। ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাঁতার কাটাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। আমি আর দিদি এক হাতে ডিঙ্গি ধরে অন্যহাত ও পা ব্যবহার করে সাঁতার কাটছিলাম। একটা সময় আর পারছিলাম না। ফের ডিঙ্গিতে উঠে পড়ি। মনে হচ্ছিল জ্ঞান হারিয়েছি।’’ শেষ পর্যন্ত তীরের সন্ধান পেয়েছিল মারদিনি। পৌঁছে গিয়েছিল গ্রিসে।

যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করেছিল নতুন লড়াই। ‘‘গ্রিসে কোনও রেস্তোরাঁ খাবার দিতে চাইছিল না। আমারা খাবার কিনব বলাতেও কেউ রাজি হয়নি,’’ বলছে মারদিনি। পায়ে জুতো নেই। পোশাক ভিজে। অবশেষে তাদের পাশে দাঁড়়ায় স্থানীয়রা। কয়েকজন জল দেয়, কেউ দান করে পোশাক। তবে সহানুভূতি পছন্দ নয় মারদিনির। তার কথায়, ‘‘অনেকে মনে করেন বাস্তুহীনদের কিছুই নেই। আমি আই ফোন ব্যবহার করতাম দেখে কেউ কেউ বলত, তুমি আই ফোন জানো! কেন জানব না। আসলে বাকিরা মনে করত আমরা মরুভূমিতে থাকি।’’

মারদিনিদের যাত্রার অবশ্য সেখানেই শেষ নয়। গ্রিস থেকে পায়ে হেঁটে, বাসে বা কখনও ট্রেনে চেপে সার্বিয়া, হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়া হয়ে জার্মানির বার্লিনে পৌঁছয় তারা। সেখানে ঠাঁই হয় বাস্তুহীনদের শিবিরে। তবে মাথার ওপর ছাদ ফিরে পেয়েই মারদিনি শুরু করে দেয় সুইমিং পুলের খোঁজ। সাঁতার যে তার রক্তে। বার্লিনের অন্যতম পুরনো ক্লাবে সাঁতার শুরু করে দুই বোন। ‘‘আমাদের টেকনিক দেখে ওদের ভালই লেগেছিল,’’ বলছে মারদিনি। স্থানীয় কোচ স্বেন স্প্যানারক্রেবস ২০২০ টোকিও অলিম্পিক্সের যোগ্যতাঅর্জনের জন্য দুই বোনকে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে রিওর দরজা

অভাবনীয়ভাবে খুলে যায় আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স কমিটি বাস্তুহীনদের দল নামানোর কথা ঘোষণা করতেই। যে দলের হয়ে সাঁতার কাটবে মারদিনি। একের পর এক ফোন, অভিনন্দনের বন্যা— কয়েকদিন যেন ঘোরের মধ্যে কেটেছে মারদিনির। তবে নিজেকে গুছিয়ে ফেলেছে দ্রুত। রিওতে পদক জিতলে যে ইতিহাস হবে, ভালই উপলব্ধি করেছে সে। বলছে, ‘‘স্বপ্ন সফল হল। অলিম্পিক্সই তো সব। সারাজীবনের সেরা পুরস্কার।’’ মারদিনি যোগ করছে, ‘‘জলে সব সমস্যা ছুড়ে ফেলতে পারি। জলে নামলেই আমি পাল্টে যাই।’’

Print Friendly, PDF & Email