প্রেমের ‘আর্চারি-প্রেম’

স্পোর্টস লাইফ প্রতিবেদক, বিকেএসপি : শখের বশেই মেয়েদের মতো লম্বা চুল রাখেন। কিন্তু সেই শখটা জলাঞ্জলী দিতে হয়েছে প্রেম প্রসাদ পুনের। বড় চুলে ইদানিং অস্বস্তি হয়। তাই শেষ পর্যন্ত হিন্দু ব্রাহ্মণদের ‘টিকির’ মতো মাথার পেছনে টিকিয়ে রেখেছেন বড় চুলের অস্তিত্বটুকু। তবে চুলের প্রতি নয়, প্রেম প্রসাদের সব প্রেম জড়িয়ে রয়েছে আর্চারিতে।

বিকেএসপিতে চলছে দি ব্লেজার বিডি তৃতীয় দক্ষিণ এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানেই পাওয়া গেল নেপালের তিরন্দাজ প্রেম প্রসাদকে। বয়স ছুঁয়েছে ৪৪। কিন্তু বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখনও দিব্বি খেলে চলেছেন তির-ধনুকের নিশানা ভেদের খেলা। অথচ তাঁর এক সময়ের সতীর্থ তিরন্দাজ দীপক রাজগুরুং নেপাল আর্চারি ফেডারেশনের সভাপতি। আরেক সতীর্থ কিশোর কুমার গুরুং ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য।

আর্চারিতে অবশ্য এই বয়সে খেলা চালিয়ে যাওয়া খুব বেশি অবাক করা ঘটনা না। বিশ^ আর্চারির সাবেক নাম্বার ওয়ান জাপানের হিরোশি ইয়ামামোতো খেলেছেন একটানা ছয়টি অলিম্পিক গেমস! ২৭ বছরের ক্যারিয়ার ছিল ইয়ামামোতোর। ২০০৪ সালে যখন এথেন্স অলিম্পিক গেমসে অংশ নেওয়ার পর খেলা ছেড়ে টেলিভিশনে চাকরি নেন তখন ইয়ামামোতোর বয়স ছিল ৪২ বছর।

প্রেমকে এই বয়সে খেলতে দেখে তাই খুব বেশি অবাক হননি বিকেএসপির কোচ ও প্রেমের এক সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশের নূর আলম। প্রেম প্রথম বাংলাদেশে খেলতে এসেছিলেন এই দক্ষিণ এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরে। সেই বিকেএসপিতেই দাঁড়িয়ে নূর আলম বলছিলেন, ‘ওকে প্রথম যেদিন দেখি আজও তেমনি মনে হচ্ছে। ফেসবুকে ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব রয়েছে। ওদের দেশে আমাকে প্রায়ই যেতে বলে । কিন্তু খেলা হয় না বলে যেতে পারিনি। আর্চারিতে এই বয়সেও খেলা সম্ভব। সময় আর সুযোগ থাকলে আমিও খেলতাম।’

সেই যুবক বয়স থেকেই আর্চারি টানতো প্রেমকে। হিমালয়ের দেশের প্রেমকে কখনো পাহাড় আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেভাবে আকৃষ্ট করেনি। কাল বিকেএসপিতে খেলার ফাঁকে আর্চারিতে আসার গল্পটা বলছিলেন প্রেম, ‘আজ থেকে ২০ বছর আগে খেলাটা শুরু করি। আগে তির ধনুক নিয়ে শিকারে যেতাম।

এরপর খেলতে শুরু করি।’ এই বয়সেও কিভাবে খেলে যাচ্ছেন? প্রশ্নটা করতেই হেসে বললেন, ‘টিন এজ বয়সে আমাদের মাংসপেশী যতটা ভালোভাবে কাজ করবে বয়স বেশি হয়ে গেলে ততটা শক্তি পাবে না। কখনো আমারও তেমনটা হয়। কিন্তু আমি এখনও কঠোর অনুশীলন করে যাচ্ছি। হয়তো কখনো মনের মতো রেজাল্ট পাচ্ছি না। কিন্তু খেলে যাচ্ছি ঠিকই। অনুশীলনের কারণেই এখনও খেলতে পারছি।

এটা পুরোটাই মনোসংযোগের খেলা। মানসিক ও শারীরিকভাবে ফিট থাকতে হবে। যতক্ষণ ফিট থাকব, এটা উপভোগ করব ততক্ষণ খেলে যাব।’ নেপালে রয়েছে সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ জন আর্চার। তাদের কোনো বিদেশি কোচ নেই। প্রেম নিজে থেকেই এই আর্চারদের কোচিং করান।

ভারতের জামশেদপুরে দ্বিতীয় দক্ষিণ এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে রিকার্ভে জিতেছিলেন ১টি সোনা ও ২টা রুপার পদক। শিলংয়ে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে জেতেন রিকার্ভের ব্যক্তিগত ইভেন্টে ব্রোঞ্জ। গত নভেম্বরে এসেছিলেন ঢাকায় হওয়া এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে। তবে সেবার প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেন।

বাংলাদেশের এসেছেন অন্তত ৮-১০ বার। কখনো বিমানে, কখনো সড়ক পথে। আর্চারি খেলার সুবাদে বাংলাদেশ ছাড়াও ঘুরেছেন ভারত, থাইল্যান্ড, ইরান, সিঙ্গাপুর, চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও হংকংয়ে।

কাঠমান্ডুতে নিজেদের দুটি বাড়ি রয়েছে প্রেমের। বাবা নান্দে পুন এক সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। বাবা-মা, তিনবোনের সবাই ইংল্যান্ডে থাকেন। কিন্তু খেলার টানে প্রেম রয়ে গেছেন কাঠমান্ডুতে। খেলে কি সংসার চলে? প্রেম বলছিলেন, ‘আসলে খেলা আমার রক্তে। বাবার দেওয়া দুটি বাড়ি থেকে ভাড়া পাই। সেটা দিয়েই দিব্যি সংসার চলছে।’

প্রেমের দুই সন্তান। ১৫ বছর বয়সী ছেলে জুডেন পুন। মেয়ে রেহানা পুনের বয়স ১২ বছর। অবশ্য বাবার মতো কেউই আর্চারি খেলতে আগ্রহী নয়। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভুমিকম্পের কথা আলাপনের এক ফাঁকে উঠে এল। ওই দুঃসহ স্মৃতির কথা জানিয়ে বলছিলেন, ‘আমার বাড়িতে কারোর ক্ষতি হয়নি ইশ^রের কৃপায়। তবে বাড়িতে ফাটল ধরেছিল। ছোট মেয়েকে নিয়ে দোতলা থেকে দৌড়ে নামতে গিয়ে পা ভেঙে যায়। আর বাম হাতের আঙুল ফেটে যায়। এরপর থেকে আঙুল দিয়ে সেভাবে ধনুক ধরতে পারেন না।’

আর্চারিকে ভালোবাসেন বলেই তবুও খেলে যাচ্ছেন। নেপালের আর্চারি অবকাঠামো ভালো না। সরকারও আর্চারির দিকে নজর দেয় না সেভাবে। প্রেমের কন্ঠে তাই হতাশা, ‘বাংলাদেশের মতো যদি আমাদের একজন চপল (কাজী রাজীব উদ্দিন চপল, সেক্রেটারি আর্চারি ফেডারেশন) থাকতো তাহলে আমরাও অনেক এগিয়ে যেতাম। আর্চারির জন্য কি করিনি?

বড় বড় নিশানা বোর্ড কাঁধে বয়ে পাহাড়ের ওপরে বসিয়েছি। খেলা শেষে আবার সেটা ফেডারেশনে ফিরিয়ে দিয়েছি। ভুমিকম্পের সময় পুকুরে পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। ওই শুকনো পুকুরে নিশানা বসিয়ে সবাইকে নিয়ে অনুশীলন করেছি।’

প্রেমের আর্চারি প্রতি এমন ভালোবাসা সত্যিই বিরল। হিমালয়-কন্যা নেপালের তিরন্দাজ যেন সেখানকার আর্চারির নিঃসঙ্গ শেরপা!

Print Friendly, PDF & Email