মা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন!‌ কিন্তু কেন?

স্পোর্টস লাইফডেস্ক : ‘‌মা, মেরি মা, প্যায়ারি মা.‌.‌.‌মাম্মা’‌, কৈলাশ খেরের সেই গানটাই গুনগুনিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে তাঁকে দেখে। কিংবা মাথা ঝুঁকিয়ে, সুরে সুরে বলতে ইচ্ছে করে ‘‌মা তুঝে সেলাম’‌।

সরোজা। ৪৬ বছরের মধ্যমবয়স্কা শুধু নন। নন সবজি বিক্রেতা। তিনি রত্নগর্ভা। মারিয়াপ্পান থাঙ্গাভেলুর মা। যে মারিয়াপ্পান শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে রিও-‌তে প্যারালিম্পিকের আসরে সোনা জিতেছেন। মারিয়াপ্পানের অসম লড়াইয়ে, সরোজার ভূমিকা অস্বীকার করার সাহস কারও হবে না। রোজ সকালে তিনি যে সাইকেলের হ্যান্ডেলে দুই থলি সবজি নিয়ে ফেরি করেন এ গলি-‌সে গলি!‌ তীব্র গরম হোক কিংবা শ্রাবণ ধারা এভাবেই ফেরি করেন সবজি!‌ গলায় যতই ব্যথা হোক, চিৎকার করতে হয়, ‘‌সবজি লে লো.‌.‌.‌’‌।

অত ভারী ভারী দু’‌দুটো ব্যাগ বয়ে নিয়ে বেড়ানো বেশ কঠিন কাজ। কিন্তু উপায় যে নেই। অধিকাংশ দিনই এত হাঁকাহাঁকি, এত পথ পেরিয়েও খালি হয় না সবজির থলে!‌ তবু যেটুকু আয়, সেটুকু নিয়েই ঘরে ফেরেন সরোজা। শনিবারের বারবেলাতেও সেভাবেই ফিরেছিলেন এক কামরার ঘরে। শরীর, মন দুই–ই তখন শ্রান্ত। কিন্তু আচমকা পাড়ার কিছু ছেলেপুলে ছুটে এসে ডাকাডাকি শুরু করল। কী হয়েছে, প্রথমটাই বুঝতেই পারেননি সরোজা।

পরে ওই পাড়ার ছেলেদের মধ্যে একজনের মোবাইলে মারিয়াপ্পানের হাই জাম্পের ছবি দেখে, বুঝতে পারেন ছেলে দারুণ কিছু করে ফেলেছে। সরাজোর এক মেয়ে, তিন ছেলে। বড় ছেলে মারিয়াপ্পান। ছেলের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এক সময় ভাবাত সরোজাকে। কিন্তু এখন আর ভাবায় না। সরোজার কথায়, ‘‌আমি ছেলেকে কোনওদিন খেলাধূলায় উৎসাহ দিইনি। আবার ওকে কিছুতে বাধাও দিইনি। যেদিন থেকে দেখলাম ও পদক জিততে শুরু করেছে।

Athletics - Men's High Jump - T42 Final

সেদিন বুঝেছিলাম, আমার ছেলে বিশেষ প্রতিভাবান। সত্যি বলতে কী, ওর জন্য বাড়তি কিছুই করতেই পারিনি। ভাল খাবারও দিতে পারিনি। জানেন ও যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পরে, তখন ভেবেছিলাম সপরিবারে আত্মহত্যা করি। কিন্তু সেদিন ছেলেই বলেছিল, আমি একদিন তোমাদের খেয়াল রাখব।

ছেলে সত্যি কথা রেখেছে। ছুটি পেলে ও শ্রমিকের কাজ করেও টাকা রোজগার করেছে। আজ ওর সব পরিশ্রম সার্থক।’‌ মায়ের এমনই হন!‌ অনেক কিছু নিঃশব্দে করেও, সব কৃতিত্ব সন্তানকে দেন। সরোজার জীবনের এই লড়াই শুনে আপ্লুত বীরেন্দ্র শেহবাগ। বলেছেন, ‘‌মারিয়াপ্পানের মা সরোজা সবজি বিক্রি করে সংসার চালান!‌ যারা অজুহাত দিয়ে বলে, পরিবারের খারাপ অবস্থার জন্য পেরে উঠিনি, জীবনে কিছু করতে পারিনি, তাদের গালে সপাটে চড় লাগল।’‌

দেশকে সোনা উপহার দেওয়ার পর অনেক আর্থিক পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন মারিয়াপ্পান। তাঁর মনও যে কত বড়, বুঝিয়ে দিয়েছেন একটি ঘোষণাতেই। মারিয়াপ্পান জানিয়েছেন, আর্থিক পুরস্কার যা পাবেন, তার থেকে ৩০ লক্ষ টাকা তিনি দেবেন ছোটবেলার স্কুলকে। এমন সোনার ছেলেকে সম্মানিত করল ভারতীয় অলিম্পিক সংস্থাও। ঠিক হয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বর প্যারালিম্পিকের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে ভারতের পতাকা বাহক হবেন মারিয়াপ্পানই।‌‌

Print Friendly, PDF & Email