লম্বা না হওয়াই তো ভালো!

স্পোর্টস লাইফডেস্ক : ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি। এই উচ্চতার জন্যই কত কথা শুনতে হতো! বয়স ২৫ হলে কী হবে, কেউ কেউ তাঁকে খোঁচাত ‘শিশু’ বলে। সব উপেক্ষা, সব অপমানের জবাব দেওয়ার জন্য বিশ্ব ক্রীড়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চই বেছে নিলেন ইলেফথিরিওস পেত্রোউনিয়াস। রিও অলিম্পিকের রিংয়ে সোনা জিতে নিয়েছেন এই গ্রিক জিমন্যাস্ট।

এমনিতেই অলিম্পিকের সোনা জেতা যেকোনো অ্যাথলেটের আজীবন লালিত স্বপ্ন। তাঁর ওপর পেত্রোউনিয়াসের কীর্তিটা গ্রিক জিমন্যাস্টিকসের ইতিহাসে তৃতীয়। এর আগের দুটি কীর্তিই অবশ্য ঘরের অলিম্পিকে, এথেন্সে। ১৯৮৬ অলিম্পিকে আইওনিস মিত্রোপুলুস ও ২০০৪ অলিম্পিকে দিমসথেনিয়াস টাম্পাকস রিংয়ে সোনা জিতেছিলেন।

পেত্রোনিউয়াস এদিকটায় ব্যতিক্রম, জিতেছেন দেশের বাইরে। পূর্বসূরি দুজনের মতো লাখো স্বাগতিক দর্শকের সমর্থন তো তিনি পাননি। বরং হয়েছে উল্টো। ২০১২ অলিম্পিকের সোনাজয়ী—ব্রাজিলের আর্থার জানেত্তির দিকেই ছিল রিওর দর্শকের সমর্থন।

অবশ্য পেত্রোনিউয়াসের জন্য এ আর নতুন কী। তিনি তো বেড়েই উঠেছেন মানুষের সমর্থন না পেয়ে। রিও অলিম্পিক শুরুর আগেই জানিয়েছিলেন, উচ্চতা কম হওয়ায় সব সময়ই তাঁর ওপর অন্যরা দাদাগিরি দেখাত, খোঁচাত। এমনকি এমন ‘অ্যান্টি-বুলিইং’ প্রচারণাও যোগ দিয়েছেন তিনি। সব খোঁচার জবাব এই এক সোনা জিতেই দিলেন পেত্রোউনিয়াস।

পদক জেতার পর বললেন, লম্বা না হওয়াই তাঁর জন্য হয়েছে সুবিধার, ‘উচ্চতার কারণে সব সময়ই আজেবাজে কথা শুনতে হতো। কিন্তু এখন আর এ নিয়ে ভাবি না। কারণ আমি জানি, যদি লম্বা হতাম, তাহলে জিমন্যাস্ট হিসেবে যা এখন করেছি, তা করতে পারতাম না। এই পদকটার জন্য কত পরিশ্রমই না করেছি।’

কঠোর পরিশ্রম আর জেদের প্রমাণ দিয়েছেন রিংয়ে, ১৬ স্কোর করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেক পেছনে ফেলেছেন পেত্রোউনিয়াস। রুপাজয়ী জানেত্তির স্কোর ছিল ১৫.৭৬৬। ব্রোঞ্জ জিতেছেন রাশিয়ার ডেনিস আবলিয়াজিন, তাঁর স্কোর ১৫.৭০০।

শুধু মানুষের খোঁচাই নয়, এই পর্যায়ে আসতে পেত্রোউনিয়াস যুদ্ধ করেছেন নিজের ছোট ছোট চাওয়াগুলোর সঙ্গেও। সেই পাঁচ বছর বয়স থেকেই শুরু করেছেন অনুশীলন, কিন্তু ছোট্ট মনটা তো তখন পাখির মতো উড়ে বেড়াত চাইত। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে আসার পর বন্ধু-সঙ্গ পাওয়ার জন্যও আনচান করে উঠত। কিন্তু ‘চাপল্য আর প্রত্যয়ে’র সেই লড়াইয়ে জয় হয়েছে দ্বিতীয়টিরই।

পেত্রোউনিয়াস শোনালেন তাঁর নিজের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প, ‘(অনুশীলনের সময়) শরীর ব্যথা করত, কনুই ব্যথা করত। মাকে বলতাম, আমি আর অনুশীলন করব না। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে চাইতাম, ওদের মতো করে বাঁচতে চাইতাম।’

কিছুদিন বিরতিও নিয়েছিলেন, যেটি হয়তো ব্যাটারি রিচার্জ করার মতো করেই কাজ করেছে। পেত্রোউনিয়াস বললেন, ‘পাগলামি করা, মোটরবাইকে চড়া, পার্টি, বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা করা, মজা করা—কয়েক বছর অন্য তরুণদের মতোই ছিলাম। কিন্তু একদিন সকালে (১৭ বছর বয়স তখন) ভাবলাম জিমে ফিরে যাই। যখন রিংয়ে উঠলাম, আমার শরীর যেন সবকিছুই মনে করতে পারছিল।

এমনভাবে কাজ করা শুরু করল যেন কখনো থামিইনি। অনেক তাজা, শক্তিশালী মনে হচ্ছিল নিজেকে।’ আট বছর আগের কোনো এক সকালের সেই ভাবনাটা না এলে কী হতো!

Print Friendly, PDF & Email